ঢাকা ০৩:২৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

উজিরপুরে সংখ্যালঘু পরিবারের জমি দখলের মরিয়া চেষ্টা: শেষ সম্বল রক্ষায় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা

বরিশালের উজিরপুর উপজেলার ওটরা ইউনিয়নের কেশবকাঠী গ্রামে একটি সংখ্যালঘু পরিবারের পৈত্রিক ভিটেমাটি জোরপূর্বক দখলের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে। শুধু জমি দখলই নয়, বসতবাড়িতে ঢুকে লাখ টাকার গাছ কেটে নেওয়ার পাশাপাশি ভুক্তভোগী পরিবারটিকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় এলাকায় চরম উত্তেজনা ও নিরাপত্তা হীনতা বিরাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভুক্তভোগী পরিবারটি উজিরপুর মডেল থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছে।

বিরোধের সূত্রপাত ও আদালতের মামলা
অভিযোগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পশ্চিম কেশবকাঠী গ্রামের বাসিন্দা সুভাষ দাস তার পৈত্রিক সূত্রে প্রাপ্ত জমি দীর্ঘদিন ধরে শান্তিপূর্ণভাবে ভোগদখল করে আসছিলেন। একপর্যায়ে তারা তাদের মালিকানাধীন জমির মধ্য থেকে ৬৬ শতাংশ জমি স্থানীয় মোতাহার মল্লিকের কাছে বিক্রি করেন। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, জমি ক্রয়ের পর থেকেই মোতাহার মল্লিক কথিতভাবে ১২০ শতাংশ জমির মালিকানা দাবি করে বসেন এবং পুরো বসতভিটা জোরপূর্বক দখলের পাঁয়তারা শুরু করেন।

এই জমি সংক্রান্ত বিরোধ নিয়ে বর্তমানে আদালতে মামলা বিচারাধীন রয়েছে (যার মধ্যে সি আর কেস নং-৪৪০/২০২৩ এবং ফৌজদারি রিভিশন নং-১৫১/২০২৪ উল্লেখযোগ্য)।

দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা ও গাছ কেটে নেওয়ার অভিযোগ
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা জানান, গত ৩০ মে মোতাহার মল্লিক, তার ছেলে জুলহাস মল্লিক ও জাহিদ মল্লিকসহ ২০-২৫ জনের একটি সশস্ত্র দল সুভাষ দাসের বসতবাড়িতে অনধিকার প্রবেশ করে। তারা আদালতের তোয়াক্কা না করে আঙিনায় থাকা বিভিন্ন প্রজাতির মূল্যবান গাছ কেটে নিয়ে যায়। এতে প্রায় অর্ধ লক্ষাধিক টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

গাছ কাটায় বাধা দিতে গেলে হামলাকারীরা দেশীয় অস্ত্র প্রদর্শন করে পরিবারটিকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়। বর্তমানে পুরো পরিবারটি চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তার অভাবে ভুগছে।

“আমরা এই দেশের নাগরিক। নিজের ভিটেমাটিতে একটু নিরাপদে আর শান্তিতে বাঁচতে চাই। প্রশাসনের কাছে আমাদের একটাই দাবি—আমরা যেন ন্যায়বিচার আর নিরাপত্তা পাই।”

সুভাষ দাস, ভুক্তভোগী

অভিযুক্ত ও প্রশাসনের বক্তব্য

এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে অভিযুক্ত মোতাহার মল্লিক গাছ কাটার কথা স্বীকার করে বলেন, “আমি দলিলমূলে ১২০ শতাংশ জমি ক্রয় করেছি এবং সেই জমির গাছই কেটেছি। বিষয়টি যেহেতু আদালতে বিচারাধীন, তাই আইন অনুযায়ী যা হওয়ার হবে।” তবে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে জমি দখলের অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।

উজিরপুর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. রকিবুল ইসলাম জানান, “সংখ্যালঘু পরিবারের পক্ষ থেকে একটি লিখিত অভিযোগ আমরা পেয়েছি। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

সুশীল সমাজের উদ্বেগ
স্থানীয় সচেতন মহল ও প্রতিবেশীরা জানান, বিষয়টি নিয়ে এর আগে একাধিকবার স্থানীয়ভাবে সালিশ-বৈঠক হলেও অভিযুক্তদের অনমনীয় ভাব ও প্রভাবের কারণে কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। একটি নিরীহ সংখ্যালঘু পরিবারের শেষ সম্বল এভাবে কেড়ে নেওয়ার চেষ্টায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তারা। ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ভুক্তভোগী পরিবারের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন স্থানীয়রা।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

উজিরপুরে সংখ্যালঘু পরিবারের জমি দখলের মরিয়া চেষ্টা: শেষ সম্বল রক্ষায় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা

উজিরপুরে সংখ্যালঘু পরিবারের জমি দখলের মরিয়া চেষ্টা: শেষ সম্বল রক্ষায় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা

Update Time : ০২:৫৭:০১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২ জুন ২০২৬

বরিশালের উজিরপুর উপজেলার ওটরা ইউনিয়নের কেশবকাঠী গ্রামে একটি সংখ্যালঘু পরিবারের পৈত্রিক ভিটেমাটি জোরপূর্বক দখলের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে। শুধু জমি দখলই নয়, বসতবাড়িতে ঢুকে লাখ টাকার গাছ কেটে নেওয়ার পাশাপাশি ভুক্তভোগী পরিবারটিকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় এলাকায় চরম উত্তেজনা ও নিরাপত্তা হীনতা বিরাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভুক্তভোগী পরিবারটি উজিরপুর মডেল থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছে।

বিরোধের সূত্রপাত ও আদালতের মামলা
অভিযোগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পশ্চিম কেশবকাঠী গ্রামের বাসিন্দা সুভাষ দাস তার পৈত্রিক সূত্রে প্রাপ্ত জমি দীর্ঘদিন ধরে শান্তিপূর্ণভাবে ভোগদখল করে আসছিলেন। একপর্যায়ে তারা তাদের মালিকানাধীন জমির মধ্য থেকে ৬৬ শতাংশ জমি স্থানীয় মোতাহার মল্লিকের কাছে বিক্রি করেন। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, জমি ক্রয়ের পর থেকেই মোতাহার মল্লিক কথিতভাবে ১২০ শতাংশ জমির মালিকানা দাবি করে বসেন এবং পুরো বসতভিটা জোরপূর্বক দখলের পাঁয়তারা শুরু করেন।

এই জমি সংক্রান্ত বিরোধ নিয়ে বর্তমানে আদালতে মামলা বিচারাধীন রয়েছে (যার মধ্যে সি আর কেস নং-৪৪০/২০২৩ এবং ফৌজদারি রিভিশন নং-১৫১/২০২৪ উল্লেখযোগ্য)।

দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা ও গাছ কেটে নেওয়ার অভিযোগ
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা জানান, গত ৩০ মে মোতাহার মল্লিক, তার ছেলে জুলহাস মল্লিক ও জাহিদ মল্লিকসহ ২০-২৫ জনের একটি সশস্ত্র দল সুভাষ দাসের বসতবাড়িতে অনধিকার প্রবেশ করে। তারা আদালতের তোয়াক্কা না করে আঙিনায় থাকা বিভিন্ন প্রজাতির মূল্যবান গাছ কেটে নিয়ে যায়। এতে প্রায় অর্ধ লক্ষাধিক টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

গাছ কাটায় বাধা দিতে গেলে হামলাকারীরা দেশীয় অস্ত্র প্রদর্শন করে পরিবারটিকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়। বর্তমানে পুরো পরিবারটি চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তার অভাবে ভুগছে।

“আমরা এই দেশের নাগরিক। নিজের ভিটেমাটিতে একটু নিরাপদে আর শান্তিতে বাঁচতে চাই। প্রশাসনের কাছে আমাদের একটাই দাবি—আমরা যেন ন্যায়বিচার আর নিরাপত্তা পাই।”

সুভাষ দাস, ভুক্তভোগী

অভিযুক্ত ও প্রশাসনের বক্তব্য

এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে অভিযুক্ত মোতাহার মল্লিক গাছ কাটার কথা স্বীকার করে বলেন, “আমি দলিলমূলে ১২০ শতাংশ জমি ক্রয় করেছি এবং সেই জমির গাছই কেটেছি। বিষয়টি যেহেতু আদালতে বিচারাধীন, তাই আইন অনুযায়ী যা হওয়ার হবে।” তবে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে জমি দখলের অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।

উজিরপুর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. রকিবুল ইসলাম জানান, “সংখ্যালঘু পরিবারের পক্ষ থেকে একটি লিখিত অভিযোগ আমরা পেয়েছি। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

সুশীল সমাজের উদ্বেগ
স্থানীয় সচেতন মহল ও প্রতিবেশীরা জানান, বিষয়টি নিয়ে এর আগে একাধিকবার স্থানীয়ভাবে সালিশ-বৈঠক হলেও অভিযুক্তদের অনমনীয় ভাব ও প্রভাবের কারণে কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। একটি নিরীহ সংখ্যালঘু পরিবারের শেষ সম্বল এভাবে কেড়ে নেওয়ার চেষ্টায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তারা। ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ভুক্তভোগী পরিবারের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন স্থানীয়রা।