
টানা কয়েকদিনের অকাল বর্ষণ আর বৈরী আবহাওয়ার পর মেঘের আড়ালে সামান্য সূর্যের দেখা মিলতেই ব্যস্ততা বেড়েছে বরিশালের উজিরপুর উপজেলার কৃষকদের। রোদকে কাজে লাগিয়ে ধান বাঁচাতে মরিয়া তারা। ফলে উজিরপুর উপজেলার সাতলা ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী ৫৬০ মিটার দীর্ঘ সাতলা সেতুটি এখন রূপ নিয়েছে কৃষকের অস্থায়ী ধান শুকানোর মাঠে। সেতুর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত তিল ধারণের ঠাঁই নেই; সর্বত্রই ছড়িয়ে রাখা হয়েছে কৃষকের কষ্টার্জিত সোনালি ধান ও খড়।
অকাল বৃষ্টিতে বিপন্ন কৃষকের স্বপ্ন
গত ৮-১০ দিন ধরে চলমান টানা বৃষ্টি ও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় উজিরপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকার কৃষকেরা চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন। মাঠের পাকা ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে অনেক জায়গায়। আবার অনেক কৃষক কষ্ট করে ধান কেটে বাড়িতে আনলেও রোদের অভাবে তা শুকাতে পারছেন না। দীর্ঘ সময় ভিজে থাকায় ধানে অঙ্কুরোদগম হওয়ার (গজিয়ে যাওয়া) আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা কৃষকের সারা বছরের পরিশ্রমকে ম্লান করে দিচ্ছে।
সেতু ও সড়কে ধানের সমারোহ
সরেজমিনে দেখা যায়, উজিরপুরের সাতলা, আগৈলঝাড়ার বাগধা, আমবৈলা, আশকোর, কালবিলাসহ গোপালগঞ্জ, কোটালীপাড়া ও মাদারীপুরের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের কৃষকেরা রোদের দেখা পেলেই সড়কের পাশে, সেতু কিংবা কালভার্টে ধান নিয়ে ভিড় করছেন। বিশেষ করে সাতলা সেতুর বিশাল এলাকা জুড়ে এখন শুধুই ধানের ঘ্রাণ।
সাতলা গ্রামের কৃষক মোঃ জামাল হাওলাদার তার আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন: “এ বছর প্রায় ৫ বিঘা জমিতে ইরি আবাদ করেছি। এক বিঘা কাটার পরই শুরু হলো টানা বৃষ্টি। সেই ধান ১০ দিন পানির নিচে পড়ে ছিল। এখন কিষাণ সংকট আর কাদা মাটির কারণে ধান তোলা যাচ্ছে না। রোদ না থাকায় এই সেতুই এখন আমাদের শেষ ভরসা।”
উৎপাদন খরচ বনাম বাজারমূল্য
কৃষকদের অভিযোগ, বর্তমানে ধান চাষের খরচ কয়েকগুণ বেড়েছে। সার, বীজ, কীটনাশক এবং শ্রমিকের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন ব্যয় মেটাতেই তারা হিমশিম খাচ্ছেন। তার ওপর বৈরী আবহাওয়া আর বাজারে ধানের নিম্নমুখী দাম কৃষকদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে। লোকসান জেনেও কেবল পরিবারের খাবার আর গবাদিপশুর খাদ্যের কথা ভেবে তারা এই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
সমাধানের দাবি ও বিশেষজ্ঞ মত
স্থানীয় কৃষকদের দাবি, সরকার যেন উৎপাদন খরচ বিবেচনা করে ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দক্ষিণাঞ্চলে অনিয়মিত বৃষ্টি ও আবহাওয়ার এই বৈরী আচরণ কৃষি ব্যবস্থাকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। তারা মনে করেন, এই সংকট মোকাবিলায় সরকারি প্রণোদনা, আধুনিক ধান সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং বাজার নিয়ন্ত্রণের কোনো বিকল্প নেই। অন্যথায় আগামীতে কৃষকেরা চাষাবাদে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন, যা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
আলতাফ হোসেন অনিক 










