ঢাকা ০৫:৩৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এবারের যুদ্ধে সামরিক কৌশলে পরিবর্তন এনেছে ইরান

শনিবার থেকেই ইসরায়েল ও উপসাগরীয় এলাকায় মার্কিন স্থাপনা লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে ইরান। ছবি সংগীত

 

এবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের হত্যার প্রতিশোধ নিতে দৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ইরান। হামলার প্রতিক্রিয়ায় গত শনিবার থেকেই ইসরায়েল ও উপসাগরীয় এলাকায় মার্কিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে তারা। হামলার দ্বিতীয় দিন, ইরানি গণমাধ্যমে খামেনির মৃত্যুর সংবাদ এলে ‘ইসলামিক রিপাবলিকের সশস্ত্র বাহিনীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ানক প্রতিশোধে’ হুঁশিয়ারি দেয় ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্প (আইআরজিসি)।

এদিকে ইরানের সেনাপ্রধান আমির হাতামি প্রতিরক্ষা চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন এবং দাবি করেন, ইরানি বিমানবাহিনী উপসাগররীয় অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটিতে বোমা নিক্ষেপ করেছে।

ভূরাজনীতি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত বছরের জুনে হওয়া সংঘর্ষেও ইরান কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছিল, তবে এবার তারা আরও আগ্রাসী ও কৌশলী। কারণ, এবারের প্রতিরোধের সঙ্গে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের অস্তিত্বের প্রশ্ন জড়িত।

ইরানের সামরিক কাঠামো

ইরানের সামরিক শক্তি জটিল ও স্তরভিত্তিক। সমান্তরাল সেনাবাহিনী, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা এবং কমান্ড স্ট্রাকচার সরাসরি সর্বোচ্চ নেতার অধীনে। আরতেশ (নিয়মিত সেনাবাহিনী) আকাশসীমা ও প্রচলিত যুদ্ধের দায়িত্বে থাকলেও আইআরজিসি কাজ করে রাজনৈতিক কাঠামো রক্ষা ও ড্রোন নিয়ন্ত্রণে। এই জটিল কাঠামো ডিজাইন করা হয়েছে দেশকে অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত হুমকি থেকে সুরক্ষার জন্য।

ইরানের পাল্টা হামলা

শনিবারের মার্কিন-ইসরায়েলি আঘাতের পর ইরান শাহেদ ড্রোন ও উচ্চগতির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে পাল্টা হামলা চালায়। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, ১৩৭টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ২০৯টি ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে, যার ফলে দুবাই ও আবুধাবি বিভিন্ন স্থানে আগুন ও ধোঁয়া দেখা গেছে।

নতুন কৌশল

ব্রিটিশ নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ জন ফিলিপস বলছেন, ‘ইরানের এবারের কৌশল মূলত ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর চাপ সহ্য করা, সামর্থ্য পুনর্গঠন এবং ক্যালিব্রেটেড অ্যাসিমেট্রিক হামলার মাধ্যমে প্রতিহিংসা জোরদার করা। এর মধ্যে রয়েছে ক্ষেপণাস্ত্র শহর শক্তিশালী করা, কমান্ড বিস্তৃত করা, ড্রোন ও প্রক্সি লড়াই এবং হিজবুল্লাহ ও মিত্র মিলিশিয়ার সমন্বয়। পাশাপাশি হুরমুজ প্রণালী বন্ধের হুমকিও দেয়া হয়েছে।’

জুন ২০২৫-এর যুদ্ধে ইরান আসলে রক্ষণাত্মক অবস্থান থেকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছিল। এবার নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, সাইবার হামলা, জ্বালানি স্থাপনা ধ্বংস বা হুরমুজ প্রণালী অবরোধের মাধ্যমে তারা আরও আগ্রাসী কৌশল গ্রহণ করেছে।

তবে প্রশ্ন আসতে পারে, এ কৌশল আসলে কতটা কার্যকর হতে পারে? আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান এখনও বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাতে সক্ষম, তবে অর্থনীতি দুর্বল, পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত এবং খামেনির মৃত্যু দেশটিকে অভ্যন্তরীণভাবে দুর্বল করেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান সীমিত বাজেট ও সরঞ্জামের মাধ্যমে বারবার হামলা চালাতে পারবে, তবে দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ-তীব্রতার সংঘাত দেশটির অর্থনীতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর বড় প্রভাব ফেলবে। তাই তেহরান উত্তেজনা বাড়ানো এবং বিরতি নেওয়ার মধ্যে সমন্বয় করছে, তারা স্থায়ী যুদ্ধে যেতে চাইছে না।

আল-জাজিরায় প্রকাশিত ‘হোয়াট ইরান’স মিলিটারি স্ট্র্যাটেজি? হাউ হ্যাজ ইট চেঞ্জড সিন্স জুন ২০২৫ ওয়ার?” শীর্ষক বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন অনুবাদ করেছেন মুহাম্মাদ শাখাওয়াত হুসাইন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

উজিরপুরে সংখ্যালঘু পরিবারের জমি দখলের মরিয়া চেষ্টা: শেষ সম্বল রক্ষায় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা

এবারের যুদ্ধে সামরিক কৌশলে পরিবর্তন এনেছে ইরান

Update Time : ০৮:৩৪:৪৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ মার্চ ২০২৬

শনিবার থেকেই ইসরায়েল ও উপসাগরীয় এলাকায় মার্কিন স্থাপনা লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে ইরান। ছবি সংগীত

 

এবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের হত্যার প্রতিশোধ নিতে দৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ইরান। হামলার প্রতিক্রিয়ায় গত শনিবার থেকেই ইসরায়েল ও উপসাগরীয় এলাকায় মার্কিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে তারা। হামলার দ্বিতীয় দিন, ইরানি গণমাধ্যমে খামেনির মৃত্যুর সংবাদ এলে ‘ইসলামিক রিপাবলিকের সশস্ত্র বাহিনীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ানক প্রতিশোধে’ হুঁশিয়ারি দেয় ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্প (আইআরজিসি)।

এদিকে ইরানের সেনাপ্রধান আমির হাতামি প্রতিরক্ষা চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন এবং দাবি করেন, ইরানি বিমানবাহিনী উপসাগররীয় অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটিতে বোমা নিক্ষেপ করেছে।

ভূরাজনীতি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত বছরের জুনে হওয়া সংঘর্ষেও ইরান কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছিল, তবে এবার তারা আরও আগ্রাসী ও কৌশলী। কারণ, এবারের প্রতিরোধের সঙ্গে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের অস্তিত্বের প্রশ্ন জড়িত।

ইরানের সামরিক কাঠামো

ইরানের সামরিক শক্তি জটিল ও স্তরভিত্তিক। সমান্তরাল সেনাবাহিনী, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা এবং কমান্ড স্ট্রাকচার সরাসরি সর্বোচ্চ নেতার অধীনে। আরতেশ (নিয়মিত সেনাবাহিনী) আকাশসীমা ও প্রচলিত যুদ্ধের দায়িত্বে থাকলেও আইআরজিসি কাজ করে রাজনৈতিক কাঠামো রক্ষা ও ড্রোন নিয়ন্ত্রণে। এই জটিল কাঠামো ডিজাইন করা হয়েছে দেশকে অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত হুমকি থেকে সুরক্ষার জন্য।

ইরানের পাল্টা হামলা

শনিবারের মার্কিন-ইসরায়েলি আঘাতের পর ইরান শাহেদ ড্রোন ও উচ্চগতির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে পাল্টা হামলা চালায়। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, ১৩৭টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ২০৯টি ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে, যার ফলে দুবাই ও আবুধাবি বিভিন্ন স্থানে আগুন ও ধোঁয়া দেখা গেছে।

নতুন কৌশল

ব্রিটিশ নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ জন ফিলিপস বলছেন, ‘ইরানের এবারের কৌশল মূলত ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর চাপ সহ্য করা, সামর্থ্য পুনর্গঠন এবং ক্যালিব্রেটেড অ্যাসিমেট্রিক হামলার মাধ্যমে প্রতিহিংসা জোরদার করা। এর মধ্যে রয়েছে ক্ষেপণাস্ত্র শহর শক্তিশালী করা, কমান্ড বিস্তৃত করা, ড্রোন ও প্রক্সি লড়াই এবং হিজবুল্লাহ ও মিত্র মিলিশিয়ার সমন্বয়। পাশাপাশি হুরমুজ প্রণালী বন্ধের হুমকিও দেয়া হয়েছে।’

জুন ২০২৫-এর যুদ্ধে ইরান আসলে রক্ষণাত্মক অবস্থান থেকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছিল। এবার নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, সাইবার হামলা, জ্বালানি স্থাপনা ধ্বংস বা হুরমুজ প্রণালী অবরোধের মাধ্যমে তারা আরও আগ্রাসী কৌশল গ্রহণ করেছে।

তবে প্রশ্ন আসতে পারে, এ কৌশল আসলে কতটা কার্যকর হতে পারে? আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান এখনও বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাতে সক্ষম, তবে অর্থনীতি দুর্বল, পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত এবং খামেনির মৃত্যু দেশটিকে অভ্যন্তরীণভাবে দুর্বল করেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান সীমিত বাজেট ও সরঞ্জামের মাধ্যমে বারবার হামলা চালাতে পারবে, তবে দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ-তীব্রতার সংঘাত দেশটির অর্থনীতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর বড় প্রভাব ফেলবে। তাই তেহরান উত্তেজনা বাড়ানো এবং বিরতি নেওয়ার মধ্যে সমন্বয় করছে, তারা স্থায়ী যুদ্ধে যেতে চাইছে না।

আল-জাজিরায় প্রকাশিত ‘হোয়াট ইরান’স মিলিটারি স্ট্র্যাটেজি? হাউ হ্যাজ ইট চেঞ্জড সিন্স জুন ২০২৫ ওয়ার?” শীর্ষক বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন অনুবাদ করেছেন মুহাম্মাদ শাখাওয়াত হুসাইন।