ঢাকা ০৩:৩৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৩ মে ২০২৬, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রক্তাক্ত ২৫ মার্চ: মেজর এম এ জলিলের জন্মভূমি ও বরিশালের গণহত্যা স্মৃতি

২৫ মার্চ ‘গণহত্যা দিবস’ আমাদের জাতীয় জীবনের এক শোকাবহ ও গৌরবোজ্জ্বল দিন। এই দিনে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম কিংবদন্তি, ৯ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর এম এ জলিল এবং তাঁর জন্মভূমি বরিশালের প্রেক্ষাপটে একটি প্রতিবেদন নিচে তুলে ধরা হলো।

বীরের জন্মভূমি ও যুদ্ধের সূচনা

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে ৯ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর এম এ জলিল একটি অবিস্মরণীয় নাম। ১৯৩৯ সালে বরিশালের উজিরপুর উপজেলার ওটরা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এই তেজস্বী বীর। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর মাধ্যমে নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন থেকেই প্রতিরোধের আগুন জ্বলে ওঠে সারা দেশে।

মেজর জলিল সেই সময়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকলেও দেশের টানে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বে বরিশাল, পটুয়াখালী ও খুলনার বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিয়ে গঠিত ৯ নম্বর সেক্টর পাকিস্তানি বাহিনীর জন্য এক দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত হয়েছিল।

বরিশালে ২৫ মার্চের কালো রাত ও গণহত্যা
২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় গণহত্যা শুরু হলেও এর রেশ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বরিশালে। বরিশালের প্রধান গণহত্যা কেন্দ্রগুলো আজও সেই ভয়াবহতার সাক্ষী।

পানি উন্নয়ন বোর্ড বধ্যভূমি

বরিশাল শহরের চাঁদমারী এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনী কয়েকশ’ নিরীহ মানুষকে লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করে।

কীর্তনখোলা তীরের রক্তপাত
নদীর পাড়ে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

উজিরপুরের তাণ্ডব
মেজর জলিলের জন্মস্থান উজিরপুর ও আশপাশের এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনী ব্যাপক অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজ চালায়। অসংখ্য মুক্তিকামী মানুষকে ধরে নিয়ে নির্মমভাবে নির্যাতন ও হত্যা করা হয়।

প্রতিরোধের নায়ক ও জাতীয় বীর
মেজর এম এ জলিল শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই বীর ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন অকুতোভয় দেশপ্রেমিক। তাঁর জন্মভূমির মাটি থেকেই প্রতিরোধের প্রথম ডাক এসেছিল। ২৫ মার্চের সেই কালরাত্রির পর তাঁর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা যেভাবে সুন্দরবন ও উপকূলীয় অঞ্চলে পাকিস্তানি বাহিনীকে পর্যুদস্ত করেছিল, তা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল।

আজকের এই গণহত্যা দিবসে আমরা যেমন পাকিস্তানি বাহিনীর সেই নৃশংসতাকে স্মরণ করছি, তেমনি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি মেজর এম এ জলিলের মতো বীরদের, যাঁদের জন্মভূমি থেকে শুরু হওয়া প্রতিরোধ আমাদের লাল-সবুজের পতাকা এনে দিয়েছে। বধ্যভূমিগুলোর সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে এই সঠিক ইতিহাস তুলে ধরাই হোক আজকের দিনের অঙ্গীকার।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয় সংবাদ

বিইউ রেডিও’র নতুন কমিটি ঘোষণা, সভাপতি নাজমুল সম্পাদক ইয়াদুল

রক্তাক্ত ২৫ মার্চ: মেজর এম এ জলিলের জন্মভূমি ও বরিশালের গণহত্যা স্মৃতি

Update Time : ১১:৫৯:১১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৫ মার্চ ২০২৬

২৫ মার্চ ‘গণহত্যা দিবস’ আমাদের জাতীয় জীবনের এক শোকাবহ ও গৌরবোজ্জ্বল দিন। এই দিনে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম কিংবদন্তি, ৯ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর এম এ জলিল এবং তাঁর জন্মভূমি বরিশালের প্রেক্ষাপটে একটি প্রতিবেদন নিচে তুলে ধরা হলো।

বীরের জন্মভূমি ও যুদ্ধের সূচনা

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে ৯ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর এম এ জলিল একটি অবিস্মরণীয় নাম। ১৯৩৯ সালে বরিশালের উজিরপুর উপজেলার ওটরা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এই তেজস্বী বীর। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর মাধ্যমে নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন থেকেই প্রতিরোধের আগুন জ্বলে ওঠে সারা দেশে।

মেজর জলিল সেই সময়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকলেও দেশের টানে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বে বরিশাল, পটুয়াখালী ও খুলনার বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিয়ে গঠিত ৯ নম্বর সেক্টর পাকিস্তানি বাহিনীর জন্য এক দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত হয়েছিল।

বরিশালে ২৫ মার্চের কালো রাত ও গণহত্যা
২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় গণহত্যা শুরু হলেও এর রেশ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বরিশালে। বরিশালের প্রধান গণহত্যা কেন্দ্রগুলো আজও সেই ভয়াবহতার সাক্ষী।

পানি উন্নয়ন বোর্ড বধ্যভূমি

বরিশাল শহরের চাঁদমারী এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনী কয়েকশ’ নিরীহ মানুষকে লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করে।

কীর্তনখোলা তীরের রক্তপাত
নদীর পাড়ে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

উজিরপুরের তাণ্ডব
মেজর জলিলের জন্মস্থান উজিরপুর ও আশপাশের এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনী ব্যাপক অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজ চালায়। অসংখ্য মুক্তিকামী মানুষকে ধরে নিয়ে নির্মমভাবে নির্যাতন ও হত্যা করা হয়।

প্রতিরোধের নায়ক ও জাতীয় বীর
মেজর এম এ জলিল শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই বীর ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন অকুতোভয় দেশপ্রেমিক। তাঁর জন্মভূমির মাটি থেকেই প্রতিরোধের প্রথম ডাক এসেছিল। ২৫ মার্চের সেই কালরাত্রির পর তাঁর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা যেভাবে সুন্দরবন ও উপকূলীয় অঞ্চলে পাকিস্তানি বাহিনীকে পর্যুদস্ত করেছিল, তা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল।

আজকের এই গণহত্যা দিবসে আমরা যেমন পাকিস্তানি বাহিনীর সেই নৃশংসতাকে স্মরণ করছি, তেমনি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি মেজর এম এ জলিলের মতো বীরদের, যাঁদের জন্মভূমি থেকে শুরু হওয়া প্রতিরোধ আমাদের লাল-সবুজের পতাকা এনে দিয়েছে। বধ্যভূমিগুলোর সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে এই সঠিক ইতিহাস তুলে ধরাই হোক আজকের দিনের অঙ্গীকার।