

📕 বাহাউদ্দিন গোলাপ
📌 মহাকালের অমোঘ আবর্তনে রুদ্র বৈশাখ আসে জীর্ণতাকে ভস্ম করে নতুন সৃষ্টির ইশতেহার নিয়ে। বাঙালির পহেলা বৈশাখ আর পাহাড়ের ‘বৈসাবি’র মোহনায় দাঁড়ালে মনে হয়, এই উৎসব আসলে এক অবিনশ্বর নৃতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক মানচিত্র। চৈত্রসংক্রান্তির তপ্ত দুপুরে যখন সমতলে ‘আমানি’ বা ভেজানো চালের জলে শরীর জুড়ানোর প্রাচীন কৃষি-রীতি চলে, ঠিক তখনই পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে বেজে ওঠে ত্রিপুরাদের ‘বৈসু’, মারমাদের ‘সাংগ্রাই’ আর চাকমাদের ‘বিজু’র সম্মিলিত প্রতিধ্বনি। এই উদযাপন কেবল মেকি আনন্দ নয়; বরং এটি জুম পাহাড়ের আদিম কৃষি-দর্শন এবং মুঘল আমলের ‘ফসলি সনে’র এক ঐতিহাসিক মেলবন্ধন। কিন্তু আজ যখন চাকমাদের ‘ফুল বিজু’তে কাপ্তাই হ্রদের শান্ত জলে রঙিন সব ফুল ভাসিয়ে দেওয়া হয়, তখন তা কেবল সুন্দরের আরাধনা থাকে না; তা হয়ে ওঠে ১৯৬০-এর দশকে কাপ্তাই বাঁধের কৃত্রিম প্লাবনে নিমজ্জিত হওয়া ৫৪ হাজার একর আবাদি জমি আর বাস্তুচ্যুত লাখো মানুষের ভিটেমাটি হারানোর এক চিরন্তন শোকগাথা। আমরা পাহাড়ের মানুষের রঙিন পোশাক দেখি, কিন্তু সেই পোশাকের পরতে পরতে ঢাকা পড়া বাস্তুভিটা হারানোর ক্ষত আজও আমাদের নাগরিক চোখে অদেখা রয়ে যায়।
পাহাড়ের এই প্রাণের স্পন্দন কেবল মেঘ-ছুঁই গিরিচূড়াতেই সীমাবদ্ধ নয়, তা বরেন্দ্রভূমির লাল মাটিতে বসবাসরত সাঁওতালদের ‘বাহা’ কিংবা ওরাওঁদের ‘ফাগুয়া’র মাদলের শব্দের সাথে একই সমান্তরালে চলে। পাহাড়ের প্রতিটি ঘরে যখন ‘পাজন’ রান্না হয়—যেখানে বুনো সবজি আর ভেষজ লতাগুল্মের অন্তত ত্রিশ থেকে শত পদের সংমিশ্রণ ঘটে—তখন তা আমাদের আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞানের যান্ত্রিকতাকে চ্যালেঞ্জ করে। এটি মূলত ‘ঐতিহ্যগত বাস্তুসংস্থানিক জ্ঞান’ বা TEK-এর এক অনন্য প্রকাশ, যা আমাদের শেখায় কীভাবে প্রকৃতির বুক থেকে নিজের খাবার নিজে সংগ্রহ করার ‘খাদ্য সার্বভৌমত্ব’ রক্ষা করতে হয়। সমতলের বাঙালি যখন চৈত্রসংক্রান্তির ভোরে এক ফোঁটা শান্তির খোঁজে ব্যাকুল হয়, পাহাড়ের জুমচাষি তখন প্রথম বৃষ্টির মেঘ দেখে গেয়ে ওঠে নতুন জীবনের গান। তবে এই উৎসবের ডামাডোলে আমরা প্রায়ই ভুলে যাই যে, পাহাড় ও সমতলের এই আদিবাসী মানুষের অস্তিত্ব আজও ‘১৯০০ সালের রেগুলেশনে’র মতো ঐতিহাসিক রক্ষাকবচ কিংবা ‘পার্বত্য শান্তি চুক্তি’র যথাযথ বাস্তবায়নের মতো অমীমাংসিত প্রশ্নের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। গারো বা খাসিয়া নারীদের মাতৃতান্ত্রিক সমাজ কাঠামো যে সাম্যের শিক্ষা দেয়, তা আমাদের মূলধারার পিতৃতান্ত্রিক উদযাপনে আজও ব্রাত্য হয়ে আছে।
বর্তমান সময়ে পহেলা বৈশাখ যখন একটি করপোরেট ‘ব্র্যান্ড’ হিসেবে উপস্থাপিত হচ্ছে, তখন লোকজ সংস্কৃতির এই ‘পণ্যায়ন’ প্রান্তিক মানুষের উৎসবকে অস্তিত্বের সংকটে ঠেলে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক পরিভাষায় যাকে আমরা ‘সাংস্কৃতিক আত্মসাৎ’ বা কালচারাল অ্যাপ্রোপ্রিয়েশন বলি, তার শিকার হচ্ছে আমাদের বৈশাখ। আমরা বৈশাখী ফ্যাশনে পাহাড়ের নকশা জনপ্রিয় করি, কিন্তু পাহাড়ের সেই কারিগরের পকেট আজও শূন্যই থাকে; তাদের মেধাস্বত্ব বা ‘ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস’ নিয়ে আমাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। ডিজিটাল বিশ্বায়নের প্রবল স্রোতে আদি বাদ্যযন্ত্রের বদলে যান্ত্রিক মিউজিকের আগ্রাসন এবং পর্যটনের নামে পাহাড়ের উৎসবকে কেবল ‘চমকপ্রদ’ প্রদর্শনীতে রূপান্তর করার মধ্য দিয়ে এক ধরনের সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ কাজ করছে। আমরা পাহাড়ের মানুষকে কেবল ‘নাচ-গান’ করা জাতি হিসেবে রোমান্টিকতায় বন্দি করি, কিন্তু ‘ইকো-ট্যুরিজম’ বা উন্নয়ন প্রকল্পের নামে তাদের বাস্তুসংস্থান ও আদি ভূমি ধ্বংসের বেদনা অনুভব করি না। ককবরক, চাকমা বা মারমা ভাষার অমূল্য সব লোকগাথা যখন আমাদের জাতীয় পাঠ্যপুস্তক বা গণমাধ্যমে গৌণ হয়ে থাকে, তখন ইউনেস্কোর ঘোষিত ভাষাগত বৈচিত্র্য রক্ষার অঙ্গীকার আমাদের জাতীয় প্রেক্ষাপটে ম্লান মনে হতে পারে।
আজকের এই ক্রান্তিকালে বৈশাখের তপ্ত তাপদাহ কেবল আমাদের দেহকে দহন না করুক, তা যেন আমাদের নাগরিক ও রাজনৈতিক বিবেককেও স্পর্শ করে। পাহাড়ের গহীন থেকে যে সুর একতারার তারে এসে মিশেছে, সেই সুরটি হলো বহুত্ববাদের—যেখানে কোনো জাতিসত্তাই প্রান্তিক থাকবে না। রাঙামাটি থেকে খাগড়াছড়ি, আর বরেন্দ্রভূমির লাল মাটি থেকে চা-বাগানের নিভৃত লোকালয়—সবভাবেই বৈশাখ আসুক এক মানবিক ও রাজনৈতিক শুদ্ধি হয়ে। এই উৎসবের মহিমা তখনই সার্থক হবে, যখন পহেলা বৈশাখ কেবল পান্তা-ইলিশের মৌসুমি আমেজে আটকে না থেকে পাহাড়-সমতলের এই অটুট মৈত্রীবন্ধন, ভাষাগত বৈচিত্র্য আর আদিবাসী মানুষের সাংবিধানিক ও ভূমি অধিকারকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ধারণ করতে পারবে। সমতলের একতারা আর পাহাড়ের বাঁশি যেন একই সুরে কথা বলে—যেই সুরটি হলো মানুষের। অবিনশ্বর এই মৈত্রীর স্রোতে ভেসে যাক সব বৈরিতা ও কৃত্রিম দেয়াল; জেগে উঠুক এক মানবিক ও অখণ্ড সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য—যেখানে প্রতিটি মানুষ তার নিজ পরিচয়ে সগৌরবে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে। বৈচিত্র্য মানেই একীভূত হওয়া নয়, বরং ভিন্নতাকে স্বকীয়তায় বাঁচতে দেওয়া—এই সত্যটিই হোক আমাদের আগামীর ইশতেহার।
📕 বাহাউদ্দিন গোলাপ,
(লেখক: গবেষক, সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, b_golap@yahoo.com, 01712070133)
Reporter Name 









